Home > Editor’s Choice > মুস্তাফিজের বেড়ে ওঠার গল্প
Editor’s Choiceখেলাধুলা

মুস্তাফিজের বেড়ে ওঠার গল্প

 

ছিপছিপে দেহ। মুখে অমলিন হাসি। চোখে বিশ্ব জয়ের আত্মবিশ্বাস। বয়স মাত্র ২০ পেরিয়েছে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে এক বছরের পদচারণা। অথচ এরই মধ্যে স্থান করে নিয়েছেন কোটি ভক্তের হৃদয়ে। সাতক্ষীরার প্রত্যন্ত গ্রাম তেতুলির ছোট্ট কিশোরটি আজ এক রহস্য। ‘বিস্ময় বালক’, ‘কাটার মাস্টার’, ‘রহস্যময় কিশোর’- এরকম অনেক বিশেষণ আজ তাঁর নামের পাশে। বিশ্বের সব ক্রিকেট কিংবদন্তী তাঁর প্রশংসায় পঞ্চমুখ। হ্যাঁ, তিনি মুস্তাফিজুর রহমান। বাংলাদেশ ক্রিকেটের নয়া সেনসেশন। মাঠে তাঁর বলের বিষে নীল হয়ে যান বাঘা বাঘা সব ক্রিকেটার। অথচ মাত্র কয়েকটি মাস আগেও মুস্তাফিজ ছিলেন সাধারণ এক গ্রাম্য বালক।

দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমের জেলা সাতক্ষীরা। রাজধানী ঢাকা থেকে ৩০০ কিলোমিটার দূরে সাতক্ষীরার অবস্থান। জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার তারালি ইউনিয়নের প্রত্যন্ত গ্রাম তেতুলিয়া। ছবির মতো সুন্দর এই গ্রামটিতে ১৯৯৫ সালের ৬ সেপ্টেম্বর জন্ম গ্রহণ করেন মুস্তাফিজুর রহমান। বাবা ব্যবসায়ী আবুল কাশেমের চার ছেলে ও দুই মেয়ের মধ্যে সবার ছোট মুস্তাফিজ। তেতুলিয়া গ্রামেই শৈশব, কৈশোর কেটেছে। ছোটবেলা থেকেই বাঁ হাত দিয়ে সব কিছু করতেন মুস্তাফিজ। এমকি খেতেনও বাঁ হাত দিয়ে। অনেক কষ্ট করে পরিবারের সদস্যরা তাঁকে বিরত করেন এ অভ্যাস থেকে। কিন্তু খেলাধুলা চলতে থাকে বাঁ হাতেই। পাড়ার মাঠে বাল্যবন্ধুদের সঙ্গে টেনিস বলে ক্রিকেটের হাতে-খড়ি হয়েছিল মুস্তাফিজের। তবে ১০ বছর বয়সেই খেলার সঙ্গী হিসেবে পান তাঁর মেজ ভাই জাকির হোসেন ও সেজ ভাই মোখলেছুর রহমানকে। মজার বিষয় হলো, ১০ বছরের তখনকার মুস্তাফিজ বোলিংয়ের চেয়ে ব্যাটিং করতেই বেশী ভালোবাসতেন! তবে খেলার মাঠের একদিনের একটি ঘটনাতেই বোলিংয়ের দিকে ঝুকে পড়েন তিনি। গ্রামের মাঠে এক খেলায় একই দলে খেলছিলেন মুস্তাফিজ ও তাঁর দুই ভাই। খেলার এক পর্যায়ে প্রতিপক্ষের একজন ব্যাটসম্যানকে কিছুতেই আউট করা যাচ্ছিল না। এ সময় বল তুলে দেওয়া হয় ‘আনকোরা বোলার’ মুস্তাফিজের হাতে। আর অমনি তাঁর প্রথম বলেই আউট হন প্রতিপক্ষের সেই অপ্রতিরোধ্য ব্যাটসম্যান। মূলত এরপর থেকেই বোলিংয়ের দিকে ঝুঁকে পড়েন মুস্তাফিজ।
তবে অন্য দশটা পাড়ার ছেলের মতো মুস্তাফিজেরও ক্রিকেট খেলার পথ অতটা মসৃন ছিল না। অন্য অভিভাবদের মতো মুস্তাফিজের বাবা-মাও চেয়েছিলেন তাঁদের ছেলে লেখাপড়া শিখে ভালো কোন পেশায় প্রবেশ করুক। অন্যদিকে মুস্তাফিজের ধ্যানে-জ্ঞানে ছিল শুধুই ক্রিকেট। তাইতো তাঁকে ‘সঠিক পথে’ ফেরাতে নেওয়া হলো অভিনব এক পন্থা। ছোট্ট মুস্তাফিজ তখন ষষ্ঠ শ্রেণিতে। বাড়িতে দেওয়া হলো চার-চারজন প্রাইভেট শিক্ষক। উদ্দেশ্য একটিই, তাঁকে বাইরে খেলতে যেতে দেওয়া যাবে না! কিন্তু ‘অপ্রতিরোধ্য’ মুস্তাফিজকে আটকানো যেত না কোনভাবেই। স্কুল থেকেই সোজা চলে যেতেন মাঠে। mustafiz
ক্রিকেটের প্রতি এমন আগ্রহ দেখে মুস্তাফিজের মেজ ভাই মোখলেছুর রহমান তাঁকে সাতক্ষীরা গণমুখী ক্লাবের ক্রিকেট কোচ আলতাফ হোসেনের কাছে নিয়ে যান। এরপর তাঁর পরামর্শে মুস্তাফিজ সাতক্ষীরা স্টেডিয়ামে অনূর্ধ্ব-১৪ প্রাথমিক বাছাই পর্বে অংশ নেন। উত্তীর্ণ হন সাফল্যের সঙ্গে। মূলত এর মাধ্যমেই মুস্তাফিজের ক্রিকেট জীবন শুরু। সাতক্ষীরায় ক্রিকেট একাডেমিতে প্রশিক্ষণ নিতে থাকেন তিনি। একাডেমির দূরত্ব ছিল বাড়ি থেকে ৪৫ কিলোমিটার। যোগাযোগ ব্যবস্থাও তেমন ভালো ছিল না। কিন্তু হাল ছাড়বার পাত্র নন তাঁর সেজ ভাই মোখলেছুর রহমান। প্রতিদিন ভোরে তিনি মোটর সাইকেলে করে ৪৫ কিলোমিটার দূরে প্রশিক্ষণের জন্য নিয়ে যেতেন মুস্তাফিজকে। তৈরী হতে থাকেন মুস্তাফিজ। ঝিনুকের মধ্যে বাড়তে থাকে লুকোন মুক্তা। এরই ধারাবাহিকতায় অনূর্ধ্ব-১৪’র পর অনূর্ধ্ব-১৬ দলেও সফল হন তিনি।
এরপর ২০১২ সালে ফাস্ট বোলিং ক্যাম্পে ট্রায়াল দিতে ঢাকা আসেন মুস্তাফিজ। নজরে পড়ে যান কোচদের। ডাক পান জাতীয় অনূর্ধ্ব-১৯ দলে। তখন থেকেই সাফল্য তাঁর নিত্যসঙ্গী। কিন্তু তখনো সাফল্যের অনেকখানি পথ বাকি ছিল মুস্তাফিজের। ২০১৪ সালের অনূর্ধ্ব-১৯ নজরকাড়া পারফরমেন্স করেন মুস্তাফিজ। এরই ধারাবাহিকতায় ঘরোয়া ক্রিকেটেও করেন দারুন পারফরমেন্স। ২০১৪-১৫ সেশনে ১৯.০৮ গড়ে দখল করেন ২৬টি উইকেট। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি কাটার মাস্টারকে। নেটে নিয়মিত বোলিং করে নিজেকে আরো পরিপূর্ণভাবে প্রস্তুত করেন তিনি।
অবশেষে মুস্তাফিজের জন্য এলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। সবাইকে চমকে দিয়ে ডাক পান জাতীয় টি-টোয়েন্টি দলে। ২০১৫ সালের ২৪ এপ্রিল মিরপুর শের-ই-বাংলা জাতীয় স্টেডিয়ামে পাকিস্তানের বিপক্ষে অভিষেক হয় বিস্ময় বালকের। আর এরপর থেকেই শুরু হয় ‘মুস্তাফিক ম্যাজিক’। নিজের প্রথম আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি ম্যাচেই ৪ ওভার বোলিং করে ২০ রান দিয়ে তুলে নেন ২টি উইকেট। ৭ উইকেটে জয় পায় টাইগাররা। সেদিনই মুস্তাফিজ বিশ্ব ক্রিকেটকে জানিয়ে দেন তাঁর আগমনী বার্তা।
মুস্তাফিজের ওয়ানডে অভিষেক হয় ২০১৫ সালের ১৮ জুন ঢাকায় ভারতের বিপক্ষে। তুলে নেন প্রতিপক্ষের পাঁচটি উইকেট। জন্ম দেন এক রহস্যের। যে রহস্যকে আজও ভেদ করা সম্ভব হয়নি। একই সিরিজের পরের ম্যাচে রহস্য বালক আর্ভিভূত হন আরও ভয়ঙ্কর রূপে। সে ম্যাচে নেন ৬ উইকেট। মুস্তাফিজের জাদুতেই ভারতের বিরুদ্ধে প্রথমবারের মতো ওয়ানডে সিরিজ জয়ের স্বাদ পায় বাংলাদেশ। ওই সিরিজের তৃতীয় ম্যাচেও মুস্তাফিজের দখলে ২ উইকেট। প্রথম তিন ম্যাচে ১৩ উইকেট নিয়ে মুস্তাফিজ গড়েন বিশ্বরেকর্ড। একই বছরে ২১ জুলাই দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে টেস্ট অভিষেক হয় মুস্তাফিজের। চট্টগ্রামের ওই ম্যান অব দ্য ম্যাচ হন কাটার মাস্টার। তার দাপটেই দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে আধিপত্য বিস্তার করেছিল বাংলাদেশ। নিজের দ্বিতীয় টেস্টে তো বোলিং করার সুযোগই পাননি কাটার মাস্টার। বাংলাদেশ টস জিতে প্রথমে ব্যাট করে। কিন্তু বৃষ্টির কারণে বাংলাদেশের প্রথম ইনিংসটাই শেষ হয়নি। তাই নামের পাশে দুই টেস্ট খেলা থাকলেও পুরো সময় মুস্তাফিজ বোলিং করার সুযোগ পেয়েছেন মাত্র এক ইনিংসে। আর সেখানেই বাজিমাত করে দিয়েছেন। এছাড়া চলমান ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগে (আইপিএল) মুস্তাফিজ তার পারফরমেন্সের মাধ্যমে প্রশংসা কুড়িয়ে চলছেন বিশ্ব ক্রিকেটের সব কিংবদন্তীদের। মুস্তাফিজ জাদুতেই আইপিএলের তার নিজ দল সানরাইজার্স হায়াদরাবাদের খেলোয়ার, অফিসিয়ালসরা শিখছেন বাংলা। যা এক অনন্য দৃস্টান্ত।
মাত্র ক’দিন হলো আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বর্ষপূর্তি করেছেন মুস্তাফিজ। অথচ এরই মধ্যে সাজিয়েছেন এক ডালি রেকর্ড। এসব রেকর্ডের মধ্যে রয়েছে- ওয়ানডে সিরিজে অভিষেকে সর্বোচ্চ উইকেট নেওয়ার যৌথ বিশ্ব রেকর্ড, ৩ ম্যাচের সিরিজে অভিষেকে সর্বোচ্চ উইকেট নেওয়ার একক বিশ্ব রেকর্ড, ৩ ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজে সর্বোচ্চ উইকেট নেওয়ার একক বিশ্ব রেকর্ড, ব্রায়ান ভিটোরির পর ওয়ানডে ইতিহাসের দ্বিতীয় বোলার হিসেবে ক্যারিয়ারের প্রথম দুই ম্যাচেই ইনিংসে ৫ উইকেট, প্রথম দুই ম্যাচে ১১ উইকেট, আন্তর্জাতিক টি টেয়েন্টিতে সবচেয়ে মিতব্যয়ী বোলিংয়ের রেকর্ডও মুস্তাফিজের ঝুলিতে। এছাড়া মাশরাফি-রুবেলের পর তৃতীয় বাংলাদেশি হিসেবে ইনিংসে ৬ উইকেট, প্রথম বাংলাদেশি পেসার হিসেবে টি টোয়েন্টিতে ৫ উইকেট, সবচেয়ে কম বয়সী বোলার হিসেবে আন্তর্জাতিক টি টোয়েন্টিতে ৫ উইকেট, বিশ্বের একমাত্র বোলার হিসেবে আন্তর্জাতিক টি টোয়েন্টিতে এক ইনিংসে ৪ জন ব্যাটসম্যানকে বোল্ড করার রেকর্ড। মুস্তাফিজই একমাত্র বোলার যিনি অভিষেক টেস্ট ও ওয়ানডেতে ম্যান অব দ্যা ম্যাচ হয়েছেন। তাছাড়াও প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে আইসিসির বর্ষসেরা একাদশে ঠাঁই পান মুস্তাফিজ।
মোটকথা, মুস্তাফিজুর রহমান তার আপন মহিমায় বিশ্ব ক্রিকেটে ছড়িয়ে চলছেন এক অনন্য দ্যুতি। যার অলৌকিক আলোতে আরো উজ্জ্বল হচ্ছে মুস্তাফিজ নামক নক্ষত্রটি। তিনি পৌঁছেছেন ভক্তদের হৃদয়ের শিকড় থেকে শিখরে। মুস্তাফিজের খ্যাতি আজ বিশ্বজুড়ে। সেই সাথে বিশ্ব বাংলাদেশ ক্রিকেটকে চিনছে নতুনরূপে। মুস্তাফিজ আজ বাংলাদেশ ক্রিকেটের এক নতুন সেনসেশন। মুস্তাফিজ নামক ধ্রুবতারাটি বাংলাদেশের নাম বিশ্ব দরবারে আরো উজ্জ্বল করবেন- এমনটাই প্রত্যাশা কোটি মুস্তাফিজ ভক্তের।

এক নজরে মুস্তাফিজmustafijur rahman
পুরো নাম- মুস্তাফিজুর রহমান
ডাক নাম- মুস্তাফিজ
জন্ম- ৬ সেপ্টেম্বর, ১৯৯৫
জন্মস্থান- সাতক্ষীরা
উচ্চতা- ৫ ফুট ১১ ইঞ্চি
প্রিয় খাবার- খিচুরী, গরুর মাংস
প্রিয় জায়গা- নিজ গ্রাম
বোলিং স্টাইল- বাঁ হাতি পেসার
টি-টোয়েন্টি অভিষেক- ২৪ এপ্রিল, ২০১৫
ওয়ানডে অভিষেক- ১৮ জুন, ২০১৫
টেস্ট অভিষেক- ২১ জুলাই, ২০১৫

-ইফতেখার শুভ